শনিবার, দুপুর ১২:৩৩
৩০ আগস্ট, ২০২৫-১৫ ভাদ্র, ১৪৩২-৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৭

ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা

বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম মানেই যেন ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার আতঙ্ক। প্রতিবছর এই সময়টাতে দেশজুড়ে বাড়তে থাকে এই মশাবাহিত রোগগুলোর প্রাদুর্ভাব। শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও নাগরিক অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এসব রোগ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সমাজ ও অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গত কয়েক দশকে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার মতো রোগ বিশ্বব্যাপী দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি বড় শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়মিতই মহামারির রূপ নিচ্ছে।

ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া উভয়ই ভাইরাসঘটিত রোগ, যা এডিস ইজিপ্টাই নামক একটি বিশেষ প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশাটি মূলত দিনের বেলায় কামড়ায় এবং সাধারণত বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে প্রজনন করে। ফুলের টব, ডাবের খোসা, খোলা ড্রাম, ফ্রিজের নিচের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি এদের পছন্দের বাসা।
ডেঙ্গুর প্রধান উপসর্গ হলো হাই ফিভার, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, গায়ে র‌্যাশ, গাঁটে ও মাংসপেশিতে ব্যথা। কিছু ক্ষেত্রে এটি হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে পরিণত হয়ে জীবননাশের কারণও হতে পারে। চিকনগুনিয়ায় সাধারণত উচ্চ জ্বর ও ভয়াবহ শরীরব্যথা হয়, যা রোগমুক্তির পরেও দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
২০২৪ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহদের একটি। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৩ লাখ, মৃতের সংখ্যা ছিল ১,৭০০-এরও বেশি। এ বছরেও বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকনগুনিয়ার উপসর্গ নিয়েও অনেক রোগী হাসপাতালে ভিড় করছেন।
সরকারিভাবে লার্ভা ধ্বংসের অভিযান, মশানিধন কর্মসূচি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা সীমিত বা প্রচেষ্টাহীন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এডিস মশা ধ্বংস করা এবং এর বিস্তার ঠেকাতে নাগরিক পর্যায়ে সপ্তাহে অন্তত একদিন মশামুক্ত দিবস পালন করা – বাড়ির ছাদ, বারান্দা, আঙিনা, ড্রেনসহ আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা উচিত।

ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিক বোতল, টায়ার ইত্যাদির ভেতর যাতে পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করা।
বাড়ির জানালা ও দরজায় মশানিরোধক জাল লাগানো, রাতে অবশ্যই মশারী ব্যবহার করা।
শিশু, বয়স্ক ও রোগপ্রবণদের প্রতি বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন।
জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের করণীয়
ওয়ার্ডভিত্তিক নিয়মিত ফগিং ও লার্ভিসাইড ছিটানো।
জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও হাসপাতালগুলোর আশপাশে মশার বিস্তার রোধে কঠোর নজরদারি চালানো।
স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগীর জন্য আলাদা ওয়ার্ড ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী নিশ্চিত করা।
মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ কেবল সরকারি বা কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। একটি বাড়ি পরিষ্কার থাকলেই হবে না, আশপাশের ১০টি বাড়ি যদি অপরিচ্ছন্ন থাকে, তবে এডিস মশা নির্মূল করা অসম্ভব।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, বাসস্থান—সবখানে সচেতনতার মাধ্যমে একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়া, তরুণ সমাজ, স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই প্রচেষ্টায়।
বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ, বর্ষানির্ভর দেশকে বারবার ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হতে দেওয়া যায় না। এসব রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। আমাদের দায়িত্বশীল আচরণই পারে হাজারো প্রাণ রক্ষা করতে। এখনই সময়, নিজের ঘর, সমাজ এবং দেশকে নিরাপদ করতে এগিয়ে আসার।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn